মুক্তিযুদ্ধ, খুঁজতে হবে জনগণের কাছেই।

90

লেখকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও জনগণ মুক্তিযুদ্ধকে ‘গ-গোলের বছর’ বলে থাকে, আমরা স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা এ জন্য বেশ বিরক্ত। তাদের ওপর আমরা প্রকাশ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করতে দ্বিধা করি না। কেউ কেউ ধমক দিয়ে জনগণকে শিক্ষা দিয়ে থাকি যে, ওইটা ‘গ-গোলের বছর’ নয়, মুক্তিযুদ্ধের বছর। যাদের শেখানো হয় তারাও দূর্বল গলায় এ শিক্ষাটি গ্রহণের ভান করে আরো দূরে সরে যায়। কিন্তু একটু খুটিয়ে দেখলে সহজেই বোঝা যায় যে, জনগণ এখনো ঝিনুক যেমন মুক্তোকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রেখে লালন করে তেমনি মুক্তিযুদ্ধকেও তারা লালন করছে তাদের বুকের গভীরে। জনগণের অতল গভীরে ডুব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে তারা কিভাবে লালন করছে তা খুঁজে দেখা দরকার একনিষ্ঠ ছাত্রের মতো। মুক্তিযদ্ধের পক্ষের নিজের এবং জনগণের কাছেই উত্তর খুঁজে পেতে হবে যে কেন অনেকে মুক্তিযুদ্ধকে গ-গোলের বছর বলে থাকে?

আলোচনার সুবিধার্থে একটি কথা স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন যে, সাধারণ মানুষ ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে একটু বিরক্ত, তা তারা তাদের আচার আচরণে প্রকাশ করে থাকে। এটাকে স্বাধীনতার বিরোধীতা না ভেবে খোঁজা দরকার যে, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে জনগণের কেন এই বিরক্তি? সত্যি সত্যি এর কোনও কারণ আছে কি?

আমরা জানি যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জাতির মধ্যে এক ধরণের মিথস্ক্রিয়া শুরু হয়। ধনী গিয়ে দরিদ্রের ঘরে আশ্রয় নেয়, শিক্ষিত অশিক্ষিতের সঙ্গে বন্ধুত্ব পেতে এক সঙ্গে রাইফেল কাঁধে নিয়ে যুদ্ধে নামতে দ্বিধা করে না। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক সঙ্গে ঘুমানো, নামাজ-প্রার্থণা, পালানো, রুখে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে সামিল হয়। ভুলে যায় নারী-পুরুষের ভেদাভেদ, সবাই হয়ে ওঠে মানুষ, লড়াকু জাতি। বিজয়ের পর এই ঐক্য আরো বাড়বে বলেই ভেবেছিল সবাই।

কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হলো না। শুধু তাই নয়, লড়াইটাও কিভাবে যেন থেমে গেল। শুধু কি থেমেই গেল? ছাত্র মুক্তিযোদ্ধারা চলে গেল তাদের স্কুল-কলেজে পড়াশোনার কাজে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়, সৈনিকেরা ব্যারাকে, শ্রমিক কলকারখানায়, বেকারেরা কেউ চাকুরি পেল কেউ ভিন্ন ‘ধান্ধা’ করতে লাগলো। গ্রামের যে দরিদ্র মানুষটি তার প্রিয় ফুল তোলা কাঁথা বিছিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকতে দিল, পরম যতেœ শহুরে পরিবারগুলোকে বিপদের সময় আগলে রাখলো, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এনে যে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হলো, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলো তাদের খবর আর কেউ নিল না। বঙ্গবন্ধুর সরকার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর জন্য যে সব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যেমন নারী পূনর্বাসন কেন্দ্র, শহীদ পরিবারের সদস্যদের এতিমখানায় আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করা, তাও এক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। এক সময় প্রচার হতে লাগলো যে, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় ভুল মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচিয়ে রাখা। এসব কারণেও জনগণের অভিমান বা ক্ষোভ জন্ম নিতে পারে কি না, তা আমরা ভেবে দেখি না। আমরা ভাবি যে, জনগণ ভুল করছে, জনগণ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হয়ে পড়েছে।

কিন্তু জনগণের কাছে গেলে, তাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অভিজ্ঞতা কথা জানতে গেলে অবাক হতে হয় যে, তারাও কত যতœ করে মুক্তিযুদ্ধকে বুকের মধ্যে লালন করে চলেছে। জনগণের স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ খুঁজতে গিয়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের চর শৈলাবাড়ি গ্রামের আব্দুর রউফ মুকুলের কাছে পাওয়া গেল এমনি এক মনে দাগ কাটা মুক্তিযুদ্ধের গল্প, অথচ এই মুকুল জন্ম নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্তত তিন বছর পরে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এই গল্পটি তিনি বহন করে চলেছে পারিবারিক ভাবে। তিনি জানালেন, তার বাবা আলতাব হোসেন ছিলেন স্কুল শিক্ষক, মা রহিমা খাতুন গৃহিনী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন পাশের গ্রামে শৈলাবাড়িতে পাক-সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাগুলি শুরু হয়। গুলির শব্দ পেয়ে সব মানুষ গিয়ে আশ্রয় নেয় তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর কাছাড়ের নিচে। ভয়ে সেখানে আত্মরক্ষার জন্য চলে গেছেন তার মা-বাবাও। তার বড় ভাই আব্দুর রহিম পলাশের তখন ৭/৮ মাস বয়স। মা-বাবার কাছে শিশু সন্তানকে না দেখে গ্রামের জনৈক মফিজ্জল শেখ তার মাকে জিজ্ঞেস করেন যে, তোমাদের বাড়ির সবাইকে দেখছি, শিশু পলাশকে কোথায় রেখে এসেছ? তখন মায়ের মনে পড়ে যে ভুলে পলাশকে রেখে আসা হয়েছে ঘরের মধ্যে তালাবদ্ধ করে। তখন মা কান্না শুরু করে। মফিজ্জল তখন কাঁদতে নিষেধ করে মায়ের কাছে থেকে ঘরের চাবি চেয়ে নেয় এবং হামাগুড়ি দিয়ে ওদের বাড়িতে এসে শিশু পলাশকে নিয়ে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়।
সেই পলাশ বড় হয়েছে। ওই পরিবারে জন্ম নিয়েছে অন্যান্য সন্তানেরা। পরিবারের সকল সদস্যকে মা রহিমা খাতুন এ গল্প বলে নির্দেশ দিয়েছে, আমার এই মফিজ্জল চাচারে কেউ কোনও অসন্মান করবি না, কারণ সে আমার কোলের সন্তানরে ফিরায়া দিয়া আমার কইলজা ঠান্ডা করছে।

আব্দুর রউফ মুকুল জানালেন- তাদের মফিজ্জল দাদার পরিবারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সেই সদ্ভাব এখনো টিকিয়ে রেখেছেন তারা।