অগ্রনী ব্যাংকে ৭৪৫ মাঠসহকারীর চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে দফায় দফায় আন্দোলন

202

স্টাফ রিপোর্টার, রাজবাড়ীঃ

সরকারি মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তক্রমে ০১ আগষ্ট, ২০১১ ইং থেকে সারা দেশব্যাপী ৭৪৫ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীকে মাঠসহকারী পদে স্থায়ী করণের মৌখিক আশ্বাস দিয়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে কোন নিয়োগপত্র ছাড়াই ব্যাংকের চলমান ঋণ আদায়, বিতরণ ও সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমে নিয়োজিত করানো হয়। পরবর্তীতে মাঠসহকারীরা দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন সময় স্থায়ী করার আন্দোলন ও আবেদন করলে এক পর্যায়ে গত ২১/১০/২০১৮ ইং তারিখে সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব, আবুল মাল আব্দুল মুহিত অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব, জায়েদ বক্ত এবং সি,ই,ও/এম,ডি জনাব, মোহাম্মাদ শামসুল ইসলাম কে একটি চিঠি দেন। সেখানে মাননীয় অর্থমন্ত্রী অগ্রণী ব্যাংকের সকল অস্থায়ী কর্মীকে স্থায়ী করে নভেম্বর/১৮’র মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। কিন্তু সে প্রতিবেদন ২৫/০৯/২০১৯’ র মধ্যেও দাখিল করেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বরং ব্যাংকের এম,ডি ৭৪৫ টি মাঠসহকারীর/এসিস্ট্যান্ট অফিসার (পল্লী ঋণ) গ্রেড ০২ এর পদ সৃষ্টির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবরে কয়েকটি চিঠি দেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে সেই চিঠির কোন জবাব অগ্রণী ব্যাংকের হেড অফিসে আজো পৌঁছেনি।

এ প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রাণালয় প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নির্দেশনার মাধ্যমে বলছেন যে, পদ সৃজনের দায়িত্ব অগ্রণী ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার; যখন থেকে এটি লিমিটেডে (২০০৭ ইং সনে) রূপান্তরিত হয়েছে এবং (২০০৮ ইং সনে) নিজস্ব নিয়োগ প্রবিধানমালা প্রণয়ন করেছেন। অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের এম,ডি ( পুণঃ নিয়োজিত) বলছেন যে, তাঁর একার পক্ষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়। এতে অর্থমন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে । সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন ঠেলাঠেলি অবস্থায় ৭৪৫ জন উচ্চ শিক্ষিত মাঠসহকারী বঞ্চিত হচ্ছেন দীর্ঘ আট(৮) বছর ধরে। যারা মজুরি পাচ্ছেন ‘নো ওয়ার্ক, নো পেমেন্ট ‘ ভিত্ততে। তাদের বর্তমানে নাই কোন নির্দিষ্ট বেতন, ছুটি, চাকুরির নিশ্চয়তা। মাঝেমধ্যে চাকরিচ্যুতির আশংকায় থাকেন অনেকে।

ইতোমধ্যে ৭৪৫ জনেরই ত্রিশ (৩০ বছর) বয়স অতিক্রম হয়ে গিয়েছে। নিদারুণ মানসিক হতাশায় ফেনীর লিঠনসহ কয়েকজন মাঠসহকারী ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। গত ২৩/০৯/২০১৯ ইং রাজশাহী সার্কেলের মতিন সরকার নামের অন্য এক মাঠসহকারী মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হন।অস্থায়ী কর্মী হওয়াতে যারা পাচ্ছেন না মৃত্যুপরবর্তী কোন ক্ষতিপূরণ। তাদের পরিবার অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবনযাপন করছেন।

ব্যাংকে এক মাসে ষোল (১৬) দিন কাজ হলে, কেবল সে ষোল (১৬) দিনের মজুরি দেয়া হয় তাদের। বাকি চৌদ্দ (১৪) দিন তারা কি করে চলেন সে খবর কি কর্তৃপক্ষ কভু ভেবেছেন? ব্যবস্থাপনার এমন অবহেলায় অনেকেই চাকরিটি ছেড়ে দিয়ে বেকার হয়ে বসে আছেন। কেউবা অন্যত্র চাকরি নিয়েছে। উল্লেখ্য, সরকারী কর্মচারীদের বার্ষিক পারফরমেন্স রিপোর্ট বছরের শেষে দেয়া হলেও মাঠসহকারীদের পারফরমেন্স রিপোর্ট প্রতি তিন মাস শেষে হেড অফিসে পাঠানো হয়। সেখানে কেবল ঋণ এবং হিসাব খোলা সংক্রান্ত তথ্য থাকে। অন্য কাজগুলোর তথ্য সেখানে দেয়া হয় না। তবুও সে ত্রৈমাসিক রিপোর্টগুলো অত্যন্ত সন্তোষজনক। বিভিন্ন শাখাতে নিয়োজিত মাঠসহকারীরা ঋণ প্রদান, কিস্তি সংগ্রহ, কৃষকের হিসাব খোলা ও সাধারণ হিসাব খোলা, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান, পেনশন প্রদান, রেমিট্যান্স প্রদান এবং বিভিন্ন ডকুমেন্টস তৈরি করে থাকেন।

একটি স্বাধীন বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত যুবক/যুবতীরা চাকরির জন্য এভাবে ধুঁকে-ধুঁকে মরার কথা ছিল না। এমন অবহেলা থেকে মুক্তির জন্যেইতো জাতির পিতার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। মাঠসহকারীদের যে পদে স্থায়ী করণের জন্য ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা সুপারিশ করেছেন সেটি ছিল এসিস্ট্যন্ট অফিসার(গ্রেড০২)। বর্তমানে সেই সুপারিশ কি আদৌ বাস্তবায়িত হবে নাকি অধরাই থেকে যাবে? সেটিই এখন দেখার বিষয়। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এম,ডি সরকারের দৃষ্টি কাড়ার জন্য ব্যাংকে বঙ্গবন্ধু কর্ণার খুলেছেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন কি? জাতির জনকের আত্মা আরো বেশী খুশী হত ; যদি তিনি নিপীড়িত মাঠসহকারীদের স্থায়ীর সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতেন।

সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বর্তমান অস্থায়ীদের স্থায়ী করে নতুন কোন অস্থায়ী নিয়োগ না দিতে, অর্থ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন।

মাঠসহকারীরা সকাল সাড়ে নয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা বা তার চেয়ে বেশি সময় কাজ করেন, দিনশেষে তারা পাচ্ছেন কেবল ৬৫০/- টাকা মাত্র যা দ্বারা তাঁদের পরিবার চালাতে বেসামাল অবস্থায় পড়ছেন। এমন কি জরুরি ঋণ আদায় কর্মসূচীতে ছুটির দিনগুলোতে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঋণ আদায় করেন, তখন তাদেরকে মজুরি কিংবা ভাতা দেয়া হয় না। তাঁরা যদি অসুস্থ হয়ে কাজে যেতে না পারেন, তবে তাঁদের বেতন দেয়া হয় না। ব্যাংক বন্ধ থাকলে তখন তাঁরা বেতন পান না। অগ্রণী ব্যাংক এমন উচ্চ শিক্ষিত মাঠসহকারীকে যে হারে মজুরি প্রদান করছেন সেটা ব্যাংকে নিয়োজিত অষ্টম শ্রেণী পাশ এমএলএসএস/ড্রাইভারের চেয়ে মাত্র ১০০/- টাকা বেশি । অন্যদিকে, মাঠসহকারীদের সমান ডিগ্রিধারী একজন স্থায়ী অফিসার পাচ্ছেন ৫ গুন বেশি, সিনিয়র অফিসার পান ৯ গুন বেশি এবং ক্রমান্বয়ে উচ্চপদে নিয়োজিতরা পান ২৮/২৯ গুণেরও বেশী সুযোগসুবিধা।

সম্প্রতি ০২/০৯/২০১৯ ইং তারিখে স্থায়ী কর্মচারি/কর্মকর্তাদের জন্য অগ্রণী ব্যাংক মুনাফার অংশ হতে মুল বেতনের ৩.২৫ গুণ ইনসেন্টিব বোনাস প্রদান করেছেন। কিন্তু অস্থায়ীদের দেয়া হয়েছে মাত্র ২ গুণ। মোটকথা, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অথচ মুনাফা অর্জনে অস্থায়ী মাঠসহকারীদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

অধিকন্তু, অগ্রণী ব্যাংকের গ্রামীণ শাখাগুলোতে বর্তমানে লোকবল সংকট রয়েছে চরম। অস্থায়ী কর্মী হওয়াতে মাঠসহকারীরা (T-24 Software) আইডিতে কাজ করার সুযোগ পান না। এদের স্থায়ীকরণ করা হলে লোকবল সংকটের সমাধান হতে পারতো।