কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী তিলের খাজার কদর দেশ জুড়ে

74

কুষ্টিয়ার মুখরোচক এই তিলের খাজা এখন পরিণত হয়েছে ক্ষুদ্র শিল্পে। সারাবছরই তৈরি করা হয় তিলের খাজা। তবে শীত মৌসুমে এর আলাদা কদর রয়েছে। মে-জুন মাস পর্যন্ত চলবে তিলের খাজা মৌসুম।কুষ্টিয়ার হাজারও ঐতিহ্যের মধ্যে একটি তিলের খাজা। কুষ্টিয়ার তিলের খাজার নাম শুনলে জিভে জল আসে না এমন লোকের সংখ্যা কমই আছে।এক সময় শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তিলের খাজা তৈরি করা হতো। কালের আবর্তে এর কদর বেড়েছে দেশজুড়ে। এটি এখন পরিণত হয়েছে একটি খাদ্য শিল্পে।এ ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে বাড়তি লোকের কর্মসংস্থান। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা সৃষ্টি করা হলে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্ত সে সুবিধা না থাকার কারণে সম্ভাবনা সত্ত্বেও প্রসার ঘটছে না এই ক্ষুদ্র শিল্পের।তিলের খাজা তৈরি শিল্পীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, স্বাধীনতার পরে দেশের অনেক কিছু বদলালেও বদলায়নি এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পীদের ভাগ্য।কুষ্টিয়ার তিলের খাজার ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশের সময়ে এর আবির্ভাব ঘটে কুষ্টিয়ায়। জানা গেছে, এ অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পাল সম্প্রদায়ের লোকেরা এ উপাদেয় খাদ্যটি তৈরি করত। ভারত পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার আগে শহরের দেশওয়ালী পাড়া এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবার তিলের খাজা তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল। এর পর থেকেই কুষ্টিয়ায় আস্তে আস্তে তিলের খাজার প্রসার ঘটতে থাকে। ৭১-পর থেকে কুষ্টিয়া শহরের চর মিলপাড়ায় গড়ে ওঠে তিলের খাজা তৈরির কারখানা। তখন থেকেই ক্রমে ক্রমে কুষ্টিয়ার তিলের খাজার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশেজুড়ে।কারখানা মালিক মজিদ মেম্বার জানান, বর্তমানে ২০০ কেজি তিলের খাজা প্রতিদিন উৎপাদন করা হচ্ছে। অন্য মৌসুমে ৮০-১০০ কেজি তিলের খাজা উৎপাদন করা হয়।সরেজমিন কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু কারিগর তিলের খাজা তৈরি করায় ব্যস্ত। তিলের খাজা তৈরির প্রধান উপকরণ তিল ও চিনি। চুলায় চাপানো বড় লোহার কড়াইয়ের মধ্যে চিনি দিয়ে গণগণে আগুনে জাল দিয়ে তৈরি হয় সিরা।নির্দিষ্ট তাকে আসার পর নামানো হয় চুলা থেকে। হালকা ঠাণ্ডা হলে চিনির সিরা জমাট বেধে যায়, তখন শিংয়ের মত দো-ডালা গাছের সাথে হাতে টানা হয় জমাট বাঁধা চিনির সিরা।এক পর্যায়ে বাদামি থেকে সাদা রঙে পরিণত হলে কারিগর বিশেষ কায়দায় হাতের ভাঁজে ভাঁজে টানতে থাকে।তখন এর ভেতরে ফাঁপা আকৃতির হয়। সিরা টানা শেষ হলে রাখা হয় পরিস্কার স্থানে। নির্দিষ্ট মাপে কেটে তাতে মেশানো হয় খোসা ছাড়ানো তিল। এভাবেই তৈরি হয়ে গেল তিলের খাজা। পরে এগুলো প্যাকেটজাত করে পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে।এই ব্যবসার জন্য যথেষ্ট পুঁজির প্রয়োজন হয়। ব্যবসা আরও প্রসার হলে এ পেশার সঙ্গে নিয়োজিত কয়েক হাজার মানষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতো।কুষ্টিয়ার তিলের খাজা তৈরি ও বিক্রয়ের সঙ্গে নির্ভর করছে কুষ্টিয়ার ও বাইরের জেলার কয়েক হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা। এ শিল্পটিকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।