আজাদ বেপারীর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি

117

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম
আমি মোঃ আজাদ বেপারী; পিতা: আমির বেপারী; মাতা: সালেহা বেগম। গ্রাম: শাহেদ নগর (বেপারী পাড়া); সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকা। ১৯৭১ সালে কতই বা বয়স আমার, বড় জোর ১৩/১৪। আমার বাবা শহরের বিভিন্ন পুকুর নিয়ে মাছ চাষ করতেন, তাই বাজারে বিক্রি করতেন। এটাই আমাদের এলাকার জাত ব্যবসা। আমি বাবামায়ের একমাত্র সন্তান। সে সময় অনুযায়ী মোটামুটি সচ্ছল। লেখাপড়া তেমন শেখা হয়নি, কাজকর্মেও তেমন যাওয়া হয়নি তখনো।
অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর স্বাধীনতার জন্য দেশের সবাই উন্মুখ হয়ে ওঠে। আমাদের গ্রামের মানুষও মিছিল নিয়ে শহরে যেতে শুরু করে। এ সময়ে গ্রামের মিছিলে যারা নেতৃত্ব দিতেন তাদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন- আব্দুর কাদের , দেলবার হোসেন, তারাজুল প্রমুখ। সে সব মিছিলে আমিও যোগ দিয়েছি, বাড়ি থেকেও কোনও নিষেধ করা হতো না। বিভিন্ন স্থানে গ-গোলের খবর আসতো। কিন্তু কারো মধ্যে কোনও ভীতি দেখা যায়নি। সবাই উন্মুখ স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু এক সময় নিরীহ বাঙ্গালিদের ওপর পাকিস্তানিরা হামলা চালায়। সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা না এলেও সেসব খবর চলে আসতে থাকে। এতে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সিরাজগঞ্জেও মিলিটারি আসছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে যাদের আত্মীয়-স্বজন, বাড়িঘর আছে তারা আগেভাগেই শহর ছাড়ে। কিন্তু গ্রামে আমাদের কোনও আত্মীয়-স¦জন নেই, তাই আমরা কোথায় পালাবো? গ্রামেরই বাবার পরিচিত আফাজ বেপারী এগিয়ে আসেন সাহায্য করতে। তাদের আত্মীয় বাড়ি আছে শিয়ালকোল ইউনিয়নের চন্ডিদাস গাঁতী গ্রামের পাশের দাওভাঙ্গা গ্রামে। আফাজ বেপারী তাদের সঙ্গে সেখানে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। এদিকে, পাকসেনা আসার খবরে শহরের মধ্যে শুরু হয় লুটপাট। গ্রামে বসেই শোনা যায় জেলখানায় বিহারী হত্যাকান্ড, ন্যাশনাল ব্যাংকে (বর্তমান সোনালী ব্যাংক) লুটপাটের খবর। সে রাতেই আমি আমার মা-বাবার সাথে আফাজ বেপারীর সঙ্গে তার আত্মীয় বাড়ি দাওভাঙ্গ গ্রামে চলে যাই।
দাওভাঙ্গায় যখন ছিলাম তখন নানা খবর গুজব সেখানেও পৌঁছাতে থাকে। খবর পাই যে, শহরে ঢুকেই পাকসেনারা বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে থাকে। এ সুযোগে লুটপাট হয় ব্যাপক। তারা বিভিন্ন গ্রামের লোককে লুটপাটে উৎসাহ দেয়। তাতে যুক্ত হয় আমাদের গ্রামেরও কেউ কেউ। কখনো কখনো এসব লোকজনকে তারা গুলি করে হত্যাও করে। জানতে পারি যে, আমাদের গ্রামের দুজনকে বড় পোস্ট অফিসের মোড়ে লুটপাট করার সময় গুলি করে হত্যা করেছে। দিন যেতে থাকে। শহর থেকে গ্রামে খবর পৌঁছে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী গঠনের। অনেকে গ্রামে খবর নিয়ে য়ায়, শহরে আর আগের মতো ধরপাকড় বা মানুষ হত্যা নাই। এ পরিস্থিতিতে একদিন একাই শহরে আসি। দেখি আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি পোড়া টিন গুছিয়ে রাখি। তারপর আবার গ্রামে ফিরে যাই। কয়েকদিন পর আবার বাবামায়ের সাথে শহরে চলে আসি। কিন্তু বাড়িতো পুড়িয়ে দিয়েছে, থাকবো কোথায়?
শহরে আসার পর আমাদের পরিবারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের সেকেন গাড়িয়াল। তার ছেলের নাম আমির। আমার বাবার নাম আর তার ছেলের নাম একই হওয়ায় সেকেন গাড়িয়ালকে তিনি শশুর বলে ডাকতেন। আমি নানা বলে ডাকতাম। এ আত্মীয়তার সূত্র ধরে তার বাড়িতে গিয়ে আমরা উঠি, তিনি আমাদের জন্য একটি ঘর ছেড়ে দেন, যতদিন বাড়িতে ঘর তোলা না হবে, ততদিন সে বাড়িতে থাকার সুযোগ করে দেন। আমাকে সাধারণত বাড়ির বাইরে বের হতে দিতেন না। তবুও লুকিয়ে মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে বের হতাম। ওই সময় রেললাইনের পাশে সর্দার পাড়ার পোস্ট অফিসের মোড়ে বাজার বসানো হয়েছিল, সে বাজারে গিয়েছি মাঝেমধ্যে।
গ্রামের মধ্যেও মাঝে মাঝে পাকসেনা ও রাজাকারেরা চলে আসতো, কোনও কোনও বাড়ির মধ্যেও ঢুকে পড়তো। কেউ তাদের সামনে যাওয়ার সাহস পেতো না, দূর থেকে দেখেই নিরাপদে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতো। একদিন সেকেন গাড়িয়ালের বাড়ির মধ্যেও ঢুকে পড়ে পাকসেনা ও রাজাকারের দল। আমার মা দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, কিন্তু আমাকে ধরে ফেলে। এ সময় সেকেন গাড়িয়ালের মেয়ের পা পুড়ে গেছে, সে শুয়ে আছে বারান্দায়। আমির মামার স্ত্রী ছিলেন অবাঙালি পরিবারের। তিনি এগিয়ে আসেন। তিনি উর্দুতে আমার কথা বলেন যে, ওকে ছেড়ে দাও। পাকসেনারা জিজ্ঞেস করে যে, এ তোমার কী হয়। মামীও উত্তর দেয় যে, এ আমার ছেলে। ওরা বলে যে, তোমার এতো বড় ছেলে হয় কিভাবে? মামী বলে, হয়। এ কথা বলে মামী আমাকে ছাড়িয়ে নেয়। সেকেন নানার মেয়েকে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে- কী হয়েছে? বিমার? এ কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। পরে পাশের এক বাড়িতে ঢুকে পড়ে পাকসেনা ও রাজাকারেরা। সে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। পরে সে বাড়ি থেকে একজনকে ধরে নিয়ে চলে যায় পাকসেনা ও রাজাকারেরা।
দেশ মুক্ত হওয়ার মাস খানেক আগে পোড়া টিন দিয়ে কোনও রকমে একটি ঘর তুলে আমরা আমাদের ভিটায় চলে আসি। এদিকে ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ভিতরে আসতে শুরু করে। আমরা পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের খবর পেতে থাকি। একদিন সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাকসেনারা রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢুকে পড়ে। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সাধারণ মানুষ জয়বাংলা শ্লোগান দিতে দিতে শহরে ঢুকে পড়ে। আমাদের গ্রামের মানুষও মিছিল নিয়ে শহরে আসে, সে বিজয় মিছিলে যোগ দেই আমিও।