কাটা হাত নিয়ে হাসপাতালে তীব্র বেদনায় কাতরাচ্ছেন হৃদয়

1
0

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০২ ওয়ার্ডের ২৪ নম্বর বেডে আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় এক তরুণকে। তাঁর মুখের ডান পাশ ফোলা। নাকে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। ডান চোখের নিচে কাটা। মাথার পেছনে একাধিক জখম। তাঁর বুকের ডান পাশে ব্যান্ডেজ। ডান হাত ও কাঁধ গামছা দিয়ে ঢাকা।

আহত তরুণের চোখেমুখে তীব্র বেদনার ছাপ। কাছে গিয়ে ঘটনা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি কিছু বুঝতে পারি নাই। তাকাইয়া দেখি, আমার ডান হাতটা বাসের জানালার সঙ্গে ঝুলতেছে। এরপরই জ্ঞান হারাইয়ে ফেলি। আর কিছু মনে নাই।’

২৩ ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথা এভাবেই বলছিলেন ২০ বছর বয়সী খালিদ হাসান। একটু পর ফের চুপ হয়ে যান তিনি।

পরিবারের সদস্যদের কাছে খালিদ ভীষণ চঞ্চল তরুণ। আদর করে বাবা রবিউল ইসলাম ও মা শাহিদা বেগম তাঁকে ‘হৃদয়’ বলে ডাকেন। কিন্তু এখন বাবা-মায়ের হৃদয় ছিঁড়ে যাচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গোপালগঞ্জ সদরের বেতগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হন হৃদয়। ট্রাকের ধাক্কায় ডান হাত হারিয়েছেন তিনি। টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের চালকের সহকারী হৃদয়ের ডান হাতটি বাসের জানালায় ঝুলে থাকার কিছু পর তা সড়কে পড়ে যায়। রক্তাক্ত হৃদয়কে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে।

হাসপাতালে কথা হয় হৃদয়ের বাবা রবিউলের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওষুধ দেওয়ায় এখন ব্যথা বুঝতে পারছে না আমার ছেলে। কিন্তু ওষুধের প্রতিক্রিয়া কমে গেলেই যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে।’

পাশে দাঁড়ানো হৃদয়ে মা শাহিদা বলেন, ‘আজ ভোররাত চারটার দিকে কী যে ব্যথা ওঠে আমার ছেলের। পরে ইনজেকশন দিলে ঘুমিয়ে যায়।’

হৃদয় খেতে পারছেন কি না, জানতে চাইলে রবিউল বলেন, ‘গতকাল অপারেশনের আমার ছেলেরে আট ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। ডাক্তার বলছে বিপদ নাই। তরল খাবার খেতে বলছেন। দুধ এনে রাখছি, খায় নাই। সকালে পানিও খাইতে পারে নাই। তবে পরে বেদানার কয়েকটা দানা ও পানি খাইছে।’

রবিউলের সঙ্গে কথা বলার সময় একজন চিকিৎসক হৃদয়কে পরীক্ষা করতে আসেন। দুই-তিন দিন পরপর ডান বাহুর কাটা অংশ ড্রেসিং করা হবে বলে জানান তিনি। বলেন, ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আপাতত হৃদয়ের অবস্থা ভালো। তাঁকে নল দিয়ে স্যালাইন দেওয়া হবে না। এভাবে স্যালাইন দেওয়া হলে শরীরে পানি জমে যেতে পারে। এ জন্য হৃদয়কে তরলজাতীয় খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দেন ওই চিকিৎসক।

সুস্থ হয়ে উঠলেও হৃদয় তাঁর ডান হাতটি আর ফিরে পারে না। কিন্তু ছেলের প্রাণ বেঁচে যাওয়ায় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন বাবা রবিউল। তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে, এক ছেলের মধ্যে হৃদয় সবার ছোট। আমার সঙ্গে হৃদয়ও সংসারের হাল ধরেছিল। সংসারের কষ্ট কিছুটা দূরও হয়েছিল। ছোট মেয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রী। হৃদয় উপার্জন করায় মেয়ের পড়ার খরচ চালাতে পারছিলাম। কিন্তু এখন কী হবে, বুঝতে পারছি না।’

রবিউলের কাছ থেকে জানা যায়, গতকাল কাজ শেষে হৃদয় টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের আরেকটি বাসে করে গোপালগঞ্জ যাচ্ছিলেন। বাসের পেছনে জানালার পাশের একটি সিটে বসেছিলেন তিনি। ডান হাত দিয়ে জানালার মাঝখানের রড ধরে ছিলেন। গোপালগঞ্জের বেতগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসের পেছন দিক থেকে আসা একটি ট্রাক ওভারটেক করতে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে ট্রাকটি বাসের পেছন অংশ ঘেঁষে চলে যায়। এতে হৃদয়ের ডান হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

রবিউল বলেন, ধারদেনা করে হৃদয়ের চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। ট্রাকের চালককে ধরেছে পুলিশ। তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এখনো পাইনি। যাঁদের বিবেক রয়েছে, তারাই এটা দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here