এশীয় নেতাদের গোল টেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

2
0

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমৃদ্ধ ও শান্তিময় এশিয়া গঠনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরে বলেছেন, এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বকে আরো নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে- যেখানে অর্থনীতি হবে আরো স্থিতিশীল ও বিকাশমান। তাই এশিয়ার দেশগুলোকে সতর্ক আশাবাদী হতে হবে। এশিয়াকে তার নিজস্ব চেতনা ধরে রাখতে হবে। কেননা বিশ্বায়নের ক্রমবর্ধমান পরিবর্তন, ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে যে রকম কাছে টেনে আনে, একইভাবে কিছু মানুষকে বিছিন্ন করেও দেয়। শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও স্থিতিশীল এশিয়া গঠনে পারস্পরিক সেতু বন্ধন, যোগাযোগ বৃদ্ধি, জনগণের মতবিনিময় ও বোঝাপড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে এ অঞ্চলের নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। বুধবার যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের গিল্ড হলে স্থানীয় সময় বিকালে কমনওয়েলথ বিজনেস ফোরাম আয়েজিত ‘এশিয় নেতাদের গোল টেবিল বৈঠক : এশিয়া কী তার অগ্রগতি ধরে রাখতে পারবে?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ভবিষ্যতে তিনি এশিয়াকে কিভাবে দেখতে চান এবং আগামীতে এশিয়া দেশগুলোই যে গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে- এ লক্ষ্যে এশিয়ার নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রী যখন সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন তখন বৈঠকে থাকা এশিয় নেতৃবৃন্দ টেবিল চাপড়িয়ে তার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।

অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতে এশিয়াই বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে

শেখ হাসিনা বলেন, অতীতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে এশিয়া, ভবিষ্যতেও এই এশিয়াই বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে। কারণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে আছে সহিষ্ণুতা, কঠোর পরিশ্রম করার ক্ষমতা, মেধা আর দৃঢ় আশাবাদ। এশিয়া অঞ্চলের বিশাল শ্রমশক্তি, বাজার, প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত সাত বছরে এশিয়ার অর্জন অনেক। বিশ্বের অনেক বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ এবং পন্ডিত এশিয়ার এই অর্থনৈতিক সফলতাকে ‘মিরাকল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমৃদ্ধি নিয়ে আসে

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমৃদ্ধি এনে দেয়। তবে এটি আবার বৈষম্যও সৃষ্টি করে। আর সন্ত্রাস, সংঘাত, পুঁজিবাদ এবং অন্যান্য আহুত চ্যালেঞ্জ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। যেখানে আমাদের পদে পদে বাধা ও বিপদ রয়েছে। তরুণ, নারীসহ সব নাগরিকদের জন্য বেশি করে বিনিয়োগ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের চেতনা ও সমন্বিত মেধা দিয়ে এশিয়ার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে।

এদিকে কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে রাজধানী লন্ডনে গড়ে তোলা হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। দেশটির রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্মদিন উপলক্ষে বাকিংহাম প্যালেসসহ লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-দ্বীপসমূহ বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী এই গোলটেবিল অনুষ্ঠানে যোগদান ছাড়াও রাতে লন্ডনের স্কাই গার্ডেনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে আয়োজিত স্বাগত অভ্যর্থনা ও নৈশভোজে যোগ দেন।

কমনওয়েলথ দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য ও বিনিয়োগ

এবং উদ্ভাবনী সহযোগিতা বাড়াতে হবে

এদিকে ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী সহযোগিতা বিষয়ে কমনওয়েলথ’র ভূমিকা’ শীর্ষক অন্য একটি অংশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এ সংস্থাটিকে অবশ্যই আন্তঃকমনওয়েলথ বাণিজ্য, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং বিপুল সংখ্যক যুব জনশক্তির সৃজনশীল শক্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হতে হবে। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে ৩০ বছরের কম ৬০ শতাংশ জনশক্তিকে বিশাল সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিশাল সম্পদকে কাজে লাগানো, শ্রম বাজার সৃষ্টি, বাণিজ্য বাজার উন্মুক্ত রাখা, স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী সহযোগিতা বাড়াতে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন।

বৈঠকে বাণিজ্য উপকরণ ও সুবিধা উন্নতকরণ এবং অশুল্ক বাধা হ্রাস, অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধি, মুক্তবাজার সেবা এবং যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তি, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, ক্ষুদ্র ঋণ এবং ব্লু-ইকোনোমির উন্নয়নে একটা ফান্ড গঠনের জন্যও এশিয় নেতৃবৃন্দের সামনে প্রস্তাব দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে এই সফরের অন্যতম কর্মসূচি হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা) কমনওয়েলথ সরকার প্রধান সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিবেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ও কমওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রেসিয়া স্কটল্যান্ড কর্তৃক আয়োজিত অফিশিয়াল অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি।

সাজাপ্রাপ্ত তারেক রহমানকে ফেরত চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে দেশটিতে পলাতক থাকা বিভিন্ন মামলায় আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফেরত চাইলেন। তিনি বলেন, আমরা বৃটিশ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছি। অবশ্যই একদিন আমরা তাকে ফেরত নেব।

মঙ্গলবার লন্ডনে স্থানীয় সময় বিকেলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবিক ইস্যুতে যুক্তরাজ্যে ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক প্র্রতিষ্ঠান ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

ঢাকা ও যুক্তরাজ্যের দু’জন সাংবাদিক লন্ডনে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়ে থাকা তারেক রহমান সম্পর্কে সরকারের অবস্থান জানতে চান প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তারা প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত শুধু নয়, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আপনাকে (শেখ হাসিনা) হত্যা প্রচেষ্টার মামলার আসামি লন্ডনে অবস্থান করে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করছে, সরকারবিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছে। তাকে (তারেক জিয়া) ফেরত নেয়ার বিষয়ে সরকার থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কি না?

এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যুক্তরাজ্য একটি ফ্রি কান্ট্রি। যে কেউ কোনো দেশে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিতে পারে, সেটা সত্য। কিন্তু ওই (তারেক রহমান) ব্যক্তি অপরাধ করেছে এবং ইতোমধ্যে আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছে। আমি বুঝি না, কিভাবে যুক্তরাজ্যে একজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়ে রাখছে। এটা যুক্তরাজ্য সরকারকে প্রশ্ন করলে তারাই ভালো উত্তর দিতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্ত-কমনওয়েলথ ব্যবসা, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনার উন্নয়নের জন্য ৭ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবগুলো হলো, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শিল্প সম্ভাবনা ও উত্পাদনশীলতার খাত ভিত্তিক সমীক্ষা প্রয়োজন, ছড়িয়ে থাকা বিনিয়োগ সম্ভাবনাসহ অভিন্ন বিনিয়োগ নীতি, নির্দেশনা ও কৌশল গ্রহণ, বাণিজ্য সহায়ক সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন এবং পিটিএ ও এফটিএ’র অশুল্ক বাধা কমিয়ে আনা, সেবা বাণিজ্যের জন্য উদারশাসন এবং স্বতন্ত্র পেশার সেবা সুবিধার জন্য খোলাবাজার চালু, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ যাতায়াত এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্যাটাগরিতে নির্দিষ্ট লোকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ, অবকাঠামো এবং যোগাযোগ প্রকল্প গ্রহণ, এসএমই এবং ব্লু ইকোনমি খাতসহ উত্কৃষ্ট কেন্দ্র এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং উন্নয়ন, আরএন্ডডি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তহবিল গঠন।

বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে অধিক বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের বাংলাদেশে আরো বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এ ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করা হবে। গতকাল বুধবার বিকালে লন্ডনে একটি উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি আপনাদের বিশেষ করে এখানে উপস্থিত বিশ্বের ব্যবসা খাতের নেতৃবৃন্দকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। নিশ্চিত থাকুন, আপনারা এশিয়ার সবচেয়ে গতিশীল এফডিআইবান্ধব সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন।’ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সরকার প্রধানদের এ গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথভুক্ত সকল দেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতে একযোগে কাজ করার লক্ষ্যে কমনওয়েলথের বাস্তব সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে, কমনওয়েলথভুক্ত সকল দেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করার ক্ষেত্রে কমনওয়েলথ বাস্তব সহযোগিতা দিতে পারে।’ শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ কমনওয়েলথ ক্ষুদ্র ও দ্বীপ রাষ্ট্র (এসআইডিএস), এলএলডিসি, আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পায়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৯ কোটি মধ্যবিত্ত ভোক্তা রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও জাপানের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার। যে কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে এশিয়ার পরবর্তী শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে রিব্র্যান্ডিং করছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কমনওয়েলথ সদস্য দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে বেসরকারি অংশীদারিত্ব আশা করে। সরকার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় একশত অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, এতে নারীসহ আমাদের দক্ষ জনবলের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here