সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করল

3
0

২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে সরকার। পাশাপাশি প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সরকারের ভাষ্য না নেয়া কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ বলেও জানিয়েছেন সরকারের মন্ত্রী।

রবিবার (২২ এপ্রিল) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদন নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই প্রতিবেদন সম্পূর্ণ একতরফা, মনগড়া এবং ভিত্তিহীন। একটা দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ওই দেশের সরকারের ভাষ্য না নেয়াটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ। আমরা এ প্রতিবেদন সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছি।’

প্রতিবেদনে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অধিকার-এর তথ্যগত অমিল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তথ্যমন্ত্রী।

‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে দায়মুক্তি দেয়ার বিষয় বাংলাদেশের আইনে নেই’ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘গুম-খুনের কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার বিচার চলছে।’

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা হেফাজতের তাণ্ডবের সময় মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু এবং ক্ষেত্রবিশেষে সংবাদমাধ্যমের প্রতি সরকারের নেতিবাচক আচরণ করছে। এছাড়া বাংলাদেশর আইনে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকার দেওয়া হলেও সরকার তা সীমিত করেছে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সভা-সমাবেশ করতে হচ্ছে।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতকে প্রতিবেদনে ‘এনজিও’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এক সময়ের রাজনৈতিক দল জামায়াত এনজিও হিসেবে ঘরোয়া বৈঠকের অনুমতি চেয়েও পায়নি।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বলা হয়, প্রিন্ট ও অনলাইন গণমাধ্যম খুবই সরব এবং তাদের মতামত নিঃসংকোচে প্রকাশ করতে পারলেও যেসব গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করে তারা নেতিবাচক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানে বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতের কথা বলা হলেও সরকার কখনও কখনও সে অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না। কথা বলার অধিকারের প্রতি সরকারের একটি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কোনো কোনো সাংবাদিকও নিজে থেকেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন সরকারের দমন-পীড়নের আতঙ্কে।

টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্রের প্রচার ও প্রকাশনার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক তদবির ‘ব্যাপক প্রভাব ফেলে’ উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের সমর্থকরাই সাধারণত লাইসেন্স পায়।

বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আইনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকলেও দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের প্রসঙ্গও এসেছে প্রতিবেদনে।

মানবাধিকারকর্মীদের বরাত দিয়ে এতে অভিযোগ করা হয়, বিচারক, সরকারি কৌসুলি ও আদালতের কর্মকর্তারা অনেক আসামির কাছে ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ যারা চাচ্ছেন তাদের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে কথিত বন্দুকযুদ্ধে (ক্রসফায়ার) ১৬২ জন নিহত হয়েছেন। অধিকার নামের আরেকটি সংস্থার হিসাবে গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১১৮ জন ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ শিকার হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আসকের তথ্য অনুযায়ী গত বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর অধিকার বলেছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে আটক ছয়জনকে হত্যা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি সবিস্তারে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণের দায় মিয়ানমার প্রশাসনকে নিতেই হবে। মানবিক বিপর্যয়ের জন্য তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।

প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন সুলিভান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here