৩০% তরুণ কাজেও নেই, পড়াশোনাতেও নেই

4
0

দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কোনো কাজ করে না, আবার পড়াশোনাও করছে না। তাই তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ-তরুণীর এমন অবস্থা। কাজেও নেই, পড়াশোনাও করেন না, এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ২০২০ সালের মধ্যে কাজ ও পড়াশোনা কোনোটিই করেন না, এমন তরুণ-তরুণীর হার ২২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বিষয়ক প্রথম পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। গতকাল রোববার এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন জিইডি সদস্য শামসুল আলম। প্রতিবেদনটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এক আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়।

জিইডির ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার সঠিক পথে নেই। শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার ঘটছে। বেকারত্বের হার কিছুটা বেড়ে ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ ৪ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে তা ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য আছে। শ্রমবাজার সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের পর থেকে এ দেশে শিশুশ্রমিকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আর দীর্ঘদিন ধরেই বেকারের হার ৪ শতাংশের কাছাকাছি আছে। তিন বছর ধরে ৭ শতাংশের বেশি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, এতে নতুন নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

এ দেশের মানুষের আয় বাড়ছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬ সালে দেশের মানুষের একজনের মাসিক গড় আয় ছিল ১২ হাজার ৮৯৭ টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২৫৮ টাকা। ২০২০ সালের মধ্যে এই আয় আরও ২০ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে সংগতিপূর্ণ লক্ষ্যগুলো অর্জনে সঠিক পথেই আছে বাংলাদেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির ১৭ লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জিইডির প্রতিবেদনের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এসডিজিতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য আছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের সহযোগিতা লাগবে। এসডিজি অর্জনে আমাদের সঠিক তথ্য–উপাত্ত লাগবে। এ জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) শক্তিশালী করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেন, ‘পাইপলাইনে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সহায়তা পড়ে আছে। এই অর্থ আমরা ব্যবহার করতে পারছি না।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এ দেশে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি, এটি অন্যতম বড় সমস্যা। তাঁদের জন্য উৎপাদনশীল খাতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এ দেশে সামাজিক খাতে তুলনামূলক কম ব্যয় হচ্ছে, তবু উন্নয়ন হচ্ছে, এটি বেশ চমকের বিষয়। এ দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় কম ব্যয় হয়। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তায় প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সুশাসনের চ্যালেঞ্জও আছে। তিনি মনে করেন, জমির স্বল্পতা মধ্যে পর্যাপ্ত কৃষিজমি রেখে শিল্পায়ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম প্রমুখ। বক্তাদের অনেকেই শোভনকাজ সৃষ্টির ওপর জোর দেন।

এদিকে বিকেলে একই মিলনায়তনে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্য মেয়াদি পর্যালোচনার ওপর  মতামত সভা অনুষ্ঠিত হয়। জিইডি এই মতামত সভার আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অগ্রগতি তুলে ধরেন জিইডি সদস্য শামসুল আলম। সেখানে তিনি বলেন, এই পরিকল্পনায় যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো অর্জনে সরকার সঠিক পথেই আছে।

ওই মতামত সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায় সংগঠনের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় দেখলাম, দেশে অতি ধনীর সম্পদ বাড়ছে। এর ভালো দিক হলো, দেশের সম্পদ বাড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করা আমাদের দায়িত্ব। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করলে কর্মজীবী মানুষের কাজের নিশ্চয়তা থাকে না।’

গবেষক ও অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা বৈষম্য কমাতে হাওর এলাকা ও উত্তরবঙ্গে বিশেষ বরাদ্দ দিতে বলেন। আবার বরাদ্দ দিলে বলেন, এতে কর্মসম্পাদনের খরচ (কষ্ট অব ডুয়িং ফাংশন) বেশি। এই খাতে খরচ না করে অন্য খাতে খরচ করলে বেশি লাভ হতো।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২০ সালে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন আছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। তাই এত অল্প সময়ে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির যে হার নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারলে অন্য সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব। উল্লেখ্য, সরকারও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে।

প্রথম আলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here