বগুড়ায় প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা,খুনিদের চার ভাই চার দলের নেতা

3

বগুড়ায় মাদকের কারবারসহ চিহ্নিত অপরাধীদের কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিম (৫০)। হত্যাকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

আব্দুর রহিম বগুড়ার চকঝপু জিগাতলা গ্রামের মোজাহার সরকারের ছেলে। তিনি সাবগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য এবং এলাকায় বেশ জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। গত ১৪ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে বগুড়ার অদ্দিরখোলা বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে আব্দুর রহিমকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ১৬ নভেম্বর আব্দুর রহিমের বড়ভাই আব্দুল বাছেদ সরকার বাদী হয়ে এজাহারভুক্ত ১১ জন এবং অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করে বগুড়া সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনাস্থল বগুড়ার সাবগ্রাম ইউনিয়নের অদ্দিরখোলা বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সবার মাঝেই শোক, ক্ষোভ আর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তবে আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না।

চকঝপু জিগাতলা গ্রামে মৃতের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, শোকাহত পরিবারের সদস্যদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বৃদ্ধ মা ছমিরন বেগম ছেলের কবরের পাশে বসে আহাজারি করছেন। ছেলেকে হারিয়ে এক মুহূর্তের জন্য তিনি ছেলের কবরের পাশ ছাড়েননি। এসময় ছেলের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় এক মুদি দোকানদার জানান, আব্দুর রহিম একজন সফল মৎস্য চাষি ছিলেন। একই সাথে তিনি একজন ভালো মানুষ ও জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি মাদক, সন্ত্রাসসহ অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। গত বুধবার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে এলাকাবাসির পক্ষ থেকে মানববন্ধন কর্মসূচি পারিত হয়। যে কর্মসূচিতে হাজার হাজার নারী-পুরুষ অংশ নেন।

মামলার বাদী মৃত আব্দুর রহিমের বড়ভাই আব্দুল বাছেদ সরকার জানান, মাদক, সন্ত্রাসসহ অন্যায় অপরাধের প্রতিবাদের কারণেই আব্দুর রহিমকে জীবন দিতে হয়েছে। যারা আব্দুর রহিমকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তারা মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত। মামলার আসামি মনির, ইলিয়াছ, ইকবাল ও ইসরাইল চার ভাই। এদের বাবা মৃত ইউনুছ সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বড়ভাই ইকবাল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, ইলিয়াছ ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি, মনির ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি এবং ইসরাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। আরেক ভাই হারুনুর রশিদ ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর।

এই পরিবারটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে মিশে গিয়ে যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সেই দলের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এই এলাকাকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। ইসরাইল ও মনিরের ছত্রছায়ায় মামলার অপর আসামি সাইফুল ও ঠান্ডুসহ অনেকে এই এলাকাকে মাদকরাজ্যে পরিণত করেছে। মাদক ব্যবসায়ী সাইফুল ৫ বছর আগে রিকশা চালাতেন। এখন ৫টি ট্রাকের মালিক। ঠান্ডু মাদক ব্যবসা করে কোটি টাকার বাড়ি বানিয়েছেন। এই মাদক কারবারের প্রতিবাদ করার কারণেই আব্দুর রহিমকে হত্যা করা হয়েছে। দুই মাস আগে রাজু নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে ইয়াবাসহ পুলিশকে ধরিয়ে দেয় আব্দুর রহিম। এরপরপরই সাইফুল ও ঠান্ডু ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আব্দুর রহিমকে থামাতে এসেছিলেন। আব্দুর রহিম টাকা না নিয়ে তাদেরকে তাড়িয়ে দিলে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ইসরাইল হুমকি দিয়ে বলে আব্দুর রহিম যদি থেমে না যায় তাহলে তাকে ফেলে দেয়া হবে।

আব্দুর রহিমের ছোটবোন মরিয়ম আকতার মনিকা জানান, আসামিরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু পুলিশ তাদেরকে ধরছে না। এমনকি ঘটনার পর থেকে গ্রেফতারের পরিবর্তে আসামিদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বেল্লাল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আসামিরা যত বড় ক্ষমতাধরই হোক কোনো ছাড় পাবে না। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আসামিদেরকে গ্রেপ্তারের জোর চেষ্টা চলছে।

হত্যার কারণ জানতে চাইলে তিনি আরো জানান, আব্দুর রহিম কিছুদিন আগে ইসরাইলকে বেদম মারপিট করেছিলেন। তাছাড়া প্রতিবাদী হওয়ার কারণে দীর্ঘদিনের আক্রোশের শিকার হয়েছেন তিনি। যার কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।