গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করার ‘অঙ্গীকার’ বিএনপির

10

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে চায় বিএনপি। এজন্য কোনও জনগণকে সঙ্গে  নিয়ে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার  ‘অঙ্গীকার’ করেছেন দলটির নীতি-নির্ধারণী নেতারা। রবিবার (২৪ নভেম্বর) বিকালে রাজধানীর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে তারা এই ‘অঙ্গীকার’ করেন।

বিএনপির ঢাকা দক্ষিণ মহানগর কমিটির সেক্রেটারি কাজী আবুল বাশারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা বক্তব্য দেন। তারা বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেন। এ সময় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন বিষয়েও তারা আলোচনা করেন।

বিএনপির দায়িত্বশীলরা জানান, সমাবেশের অনুমতি পেতে দেরি হওয়ায় একটি পিকআপ ভ্যানে অস্থায়ী মঞ্চ করা হয়।

সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের একটি লক্ষ্য। তা হলো খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য একটি গণঅভ্যুত্থান গড়ে তোলা। বেআইনিভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সাজা দিয়ে খালেদা জিয়াকে ২০ মাস ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। অথচ একই সময়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের নামে যে মামলা হয়েছিল, সেগুলো তুলে নেওয়া হয়েছে। আর খালেদা জিয়ার নামে থাকা ৪টি মামলার জায়াগায় এখন  হয়েছে ৩৫টি।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘কোনও বিভক্তি নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে আন্দোলনে নামতে হবে। দ্রুত জনগণকে সংগঠিত করে রাজপথে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবো।’

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্যের বলে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘সমস্ত মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। দুর্বার গণআন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সরকারকে উৎখাত করতে হবে। ফলে, আজকে সবাইকে অন্য কোনও স্লোগান না দিয়ে, ‘এই সরকার নিপাত যাক’ স্লোগান দিতে হবে।’’

প্রসঙ্গত, গত ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন খালেদা জিয়া। এ বছরের মাঝামাঝি তাকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (হাসপাতালে) প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন আছেন। তার স্বজনেরা অভিযোগ করে আসছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। জামিনে মুক্তি পেলে তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা করাবেন স্বজনরা।

‘খালেদা-তারেকের মামলার বিচারকরা পুরস্কৃত হয়েছেন’

সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘যে দুই বিচারক খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে সাজা দিয়েছেন, তাদের সরকার পুরস্কার দিয়ে হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। আর সেই বিচারক তারেক রহমানকে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস দিয়েছিলেন, তাকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যেতে হয়েছে।’
সরকারের পতনঘণ্টা বেজে গেছে দাবি করে  ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘শেখ হাসিনা কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের ক্রিকেট ম্যাচে ঘণ্টা বাজিয়ে খেলা উদ্বোধন করেছেন। আর দেশে তার পতনের ঘণ্টা বেজে গেছে। জাতীয়তাবাদী শক্তি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঠিকমতো ধাক্কা দিতে পারে, তাহলে সরকার বেশিদিন টিকতে পারবে না। ’

বিএনপির মুখ ছাড়া সবকিছুর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে’আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘মুখ ফসকে তিনি এই সত্য কথা বলে দিয়েছেন। সবকিছুর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করে হাজারও কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ৩০ টাকার পেঁয়াজ ২০০টাকা হতে পারে না। শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা পাকাপোক্তও করেছে করেছে এই সরকার।’

সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আজকে সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। যতই তারা অভিযান চালাক না কেন, এর থেকে বের হতে পারবে না। এখন অভিযান শেষ হয়ে এসেছে। এটা আমরা আগে থেকেই জানতান, কোনও কিছু শুরু হলে দুই-একটা ঘটনার পর তা আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যায়।’

আদালতের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির পাওয়ার আশা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে উল্লেখ করেন মওদুদ। তিনি বলেন, ‘সরকার বিচার ব্যবস্থাকে সম্পন্ন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে। আমরা অনেক চেষ্টা করে তাকে মুক্ত করতে পারছি না।’

সমাবেশে মির্জা ফখরুল দাবি করেন, ‘আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘এই কারণে তারা জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করে না। যারা তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে, তাদের আনুগত্য সেখানে।’

সরকার হাজার হাজার পুলিশ নিয়োগ দিচ্ছে বলে উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘কিন্তু দেশের ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই কোনোটাই কমছে না। তারা সড়ক নিয়ন্ত্রণে আইন করছে, অথচ সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আহত হচ্ছে ও নিহত হচ্ছে।’

দেশের ব্যবসা বাণিজ্য লাঠে উঠে গেছে দাবি করে ফখরুল বলেন, ‘শেয়ার বাজার থেকে হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো চলতে পারছে না।’

আওয়ামী লীগ সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে সরকার চালাতে চায় অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, মিড়িয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার সুপরিকল্পিতভাবে দেশ যেন ব্যর্থ হয়, তার জন্য কাজ করছে।’

 ‘আর সমাবেশের অনুমতি নেবে না বিএনপি’

রবিবারের সমাবেশের জন্য সকাল ১০ টা অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এরপর আমরা আর কোনও অনুমতি নেবো না। যখন প্রয়োজন হবে তখন সভা-সমাবেশ, মিটিং, মিছিল করবো। রাজপথে নামবো। এগুলো করা আমরা শাসনতান্ত্রিক অধিকার। সংবিধান অধিকার হচ্ছে—আমি আমার প্রতিবাদ করতে পারবো।’

উল্লেখ্য, রবিবার সকাল সোয়া ১১ টার দিকে বিআরটিসির মতিঝিল (কমলাপুর) ডিপোতে একটি অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, বিএনপিকে নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই নির্বাচন বাতিল করুন। নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন করুন। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করুন।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতন না হলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন না। তাই আগে শেখ হাসিনার সরকারের পতন আন্দোলন করতে হবে। এই সরকারের পতন হলে তিনি এমনিতে মুক্ত হবেন।’

সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী প্রমুখ।