পেঁয়াজের মূল্য কারসাজির হোতাদের ধরা হবে

4

পেঁয়াজের মূল্য কারসাজির পেছনে জড়িত ব্যবসায়ীদের ধরতে নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করে যেসব ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করা হয়েছে বলে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে খবর রয়েছে। এদের মধ্য থেকে ২৮ জনের কাছে পেঁয়াজ কেনাবেচার যাবতীয় তথ্য তলব করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিযোগিতা কমিশন থেকে ওই ব্যবসায়ীদের কাছে গত ১৭ নভেম্বর পৃথক চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে গত দেড় মাসে আমদানি করা পেঁয়াজের প্রতি কেজির মূল্য এবং বিক্রয় মূল্যসহ যাবতীয় তথ্য চাওয়া হয়। আগামী ২৮ নভেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য পাঠাতে বলা হয়। সূত্র বলেছে, আমদানি ও বিক্রির সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত পরীক্ষা করে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে সরকার।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন বলেন, যারা পেঁয়াজের মূল্য কারসাজির সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, পেঁয়াজের মূল্য কারসাজির অপরাধে সরকার ইতোমধ্যে ১৫ জনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে এ বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পেঁয়াজ নিয়ে যে অনৈতিক বাণিজ্য হয়েছে তার পেছনে হাতেগোনা কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী জড়িত।

তাদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ জন। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী রাজধানী ঢাকার শ্যামবাজারের। কয়েকজন রয়েছেন চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের। যেসব ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছেন, তাদের ধরতে নানামুখী তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এ সময়ে আমদানিকারকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ এনে বাজার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী মো. জামাল উদ্দিন। জামাল উদ্দিন বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন। এ ছাড়া পেঁয়াজ কারসাজিতে জড়িতরা হলেন আমদানিকারক মো. রফিকুল ইসলাম, ইয়াছিন আহমেদ, লাল বিহারী সূত্রধর, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আবা এগ্রো করপোরেশন, খান অ্যান্ড সন্স, এম এন কে সাপ্লাইয়ার্স, আবুল বসার অ্যান্ড সন্স, সাতক্ষীরার কাজী জাইদুল হক প্রমুখ। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তারা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

শ্যামবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্দেহভাজন বড় আমদানিকারক জেনি এন্টারপ্রাইজের মো. জামাল উদ্দিন একাই এক মাসে প্রায় দেড় হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করেন। গত ১৩ থেকে ১৬ নভেম্বর- এই চার দিন বাজারে পেঁয়াজ সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। এ সময় অস্বাভাবিক দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে (১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর) জেনি এন্টারপ্রাইজের নামে আমদানি করা প্রতি কেজি পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দাম পড়ে ২০ থেকে ৩৫ সেন্ট। টাকায় যার বর্তমান বিনিময় হার ১৭ থেকে ৩০ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলে সর্বসাকুল্যে খরচ পড়ে ২৭ থেকে ৪০ টাকা। মিসর থেকে এ পেঁয়াজ আমদানি করেন জেনি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. জামাল উদ্দিন। সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বাজারে জামাল উদ্দিনের পেঁয়াজ গড়ে বিক্রি হয় প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। এ বিষয়ে গতকাল শ্যামবাজারে জামাল উদ্দিনের অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। একটি সূত্র বলেছে, জামাল উদ্দিন বর্তমানে গা-ঢাকা দিয়েছেন। গোয়েন্দা নজরে থাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

আরও যেসব ব্যবসায়ীর কাছে পেঁয়াজ নিয়ে যাবতীয় তথ্য তলব করা হয়েছে তারা হলেন : পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের ইবনুল এন্টারপ্রাইজের কামাল আহমেদ, ব্রাদার্স ট্রেডের ইয়াছিন আহমেদ, ঝর্ণা এন্টারপ্রাইজের লালবিহারী সূত্রধর, রফিক ট্রেডার্সের রফিকুল ইসলাম, জেনী এন্টারপ্রাইজের মো. জামাল উদ্দিন, হাফিজ করপোরেশনের মো. হাফিজ উদ্দিন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স ইম্পেক্স, ইএসএস এন্টারপ্রাইজ, জহির ট্রেডিং আইল্যান্ড, ভাই ভাই বাণিজ্যালয়, শিল্পা এক্সপোর্ট ট্রেডিং, ঢাকার উত্তরখানের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান শক্তি রানু ট্রেডার্স, দক্ষিণখানের স্মার্ট ইন্টারন্যাশনাল, গুলশানের আমদানিকারক আবুল কাশেম ও হাজী শের মোহাম্মদ, রচনা ট্রেডিং কোম্পানি, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সেগুনবাগিচার এসএম করপোরেশন, বিজয়নগরের তাশো এন্টারপ্রাইজ, মতিঝিলের রামিশা এন্টারপ্রাইজ, মালিবাগের নাসিমা ফ্যাশন, মোহাম্মদপুরের আধুনিক ইন্টারন্যাশনাল, কেরানীগঞ্জের সূর্য ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল, যাত্রাবাড়ীর এসবিএক্সিম বাংলাদেশ, চট্টগ্রামের কার্মেন ইন্টারন্যাশনাল, আবা অ্যাগ্রো। এ ছাড়া রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের আড়তদার হাজি আবদুর রাজ্জাক, শ্যামবাজারের আড়তদার আবদুর রহিম ও ফাতেমা ইন্টারন্যাশনাল।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক মাসে (১৫ অক্টোবর থেকে ১৬ নভেম্বর) যে সকল আমদানিকারক পেঁয়াজ আমদানি করেছেন তাতে প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় দাম ছিল সর্বোচ্চ ৪০ সেন্ট এবং সর্বনিম্ন ২০ সেন্ট। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যথাক্রমে ৩৪ টাকা এবং ১৫ টাকা। কাস্টমস সূত্র বলেছে, বন্দরে খালাসের সময় এটি ছিল পেঁয়াজের ‘শুল্ক্কায়ন’ মূল্য। এর সঙ্গে যোগ হয় পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ। চীন, মিসর, মিয়ানমার, তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে এসব পেঁয়াজ আনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ এসেছে চীন থেকে। চীন থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের গড় দাম ৪০ সেন্ট বা ৩৪ টাকা। মিসর ২৯ সেন্ট বা ২৫ টাকা। মিয়ানমার ৪০ সেন্ট বা ৩৪ টাকা, পাকিস্তান ৩০ সেন্ট বা ২৫ টাকা পঞ্চাশ পয়সা ও তুরস্ক ১৭ সেন্ট বা ১৫ টাকা।

শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সংকটের মধ্যে আমদানি করা এসব পেঁয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হয় গড়ে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। তারা স্বীকার করেছেন, অসাধু কতিপয় ব্যবসায়ী মাত্রাতিরিক্ত ব্যবসা করে মুনাফা লুটে নিয়েছেন। তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা। শ্যামবাজার কৃষিপণ্য বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. মাজেদ বলেন, কালোবাজারি ব্যবসা না করার জন্য সমিতির পক্ষ থেকে বলা হলেও কেউ তাদের কথা শোনেননি। সাম্প্রতিক বাজার অস্থিশীলতার মধ্যে অসাধু কিছু ব্যবসায়ী অস্বাভাবিক দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে স্বীকার করেন তিনি।

জানা যায়, বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা দৈনিক ছয় হাজার টন। শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজ সরবরাহ যথেষ্ট নয় এখনও। তারা আরও বলেন, ভারত ফের রপ্তানি শুরু না করলে দেশে পেঁয়াজের দাম দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। আমদানিকারক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজ আনার পর নানা হাত বদল হয়। আমদানিকারক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী- প্রত্যেকেই কম বেশি সুবিধা নিয়েছে। অস্থিরতার জন্য পাইকারদের দায়ী করে তিনি বলেন, তারা বেশি মুনাফা করেছেন। তবে আমদানিকারকরা মজুদ করেন না বলে দাবি করেন তিনি। ৪০ টাকার পেঁয়াজ ২৫০ টাকা বিক্রি হয় কীভাবে, এর জন্য দায়ী কে- এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি। পেঁয়াজের দাম কারসাজির জন্য খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী দায়ী বলে মনে করেন জেটি এন্টারপ্রাইজের মো. সোহেল।

১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর কেজিপ্রতি আমদানির গড় দাম

চীন মিসর     মিয়ানমার     তুরস্ক পাকিস্তান
৩৪ টাকা ২৫ টাকা ৩৪ টাকা ১৪.৫০ টাকা ২৫.৫০ টাকা

সূত্র:সমকাল