রিকশাচালক থেকে কোটিপতি, রয়েছে ক্যাডার বাহিনী

20

জুয়েল রানা। রিকশাচালক থেকে মাত্র ১০ বছরে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। ঢাকা শহরে একাধিক বাড়ি, গাড়ি, দোকানের মালিক তিনি। জমির মালিক হিসেবে তার নামে মিরপুরের বিভিন্নস্থানে ঝুলছে সাইনবোর্ড। যখনই বের হন সঙ্গে থাকে মোটরসাইকেলের বিশাল বহর। তার বিলাসবহুল গাড়ির পেছনে মোটরসাইকেলে করে প্রটৌকল দেয় তার কর্মীরা। দলীয় কর্মসূচিতে তার ছবি সম্বলিত পোস্টার নিয়ে অংশ নেয় তার অনুসারীরা। স্লোগান হয় তার নামে।

পল্লবী এলাকায় দেয়ালে-দেয়ালে ঝুলছে তার পোস্টার। কোথাও কোথাও বড় আকারের ডিজিটাল ব্যানার, সাইনবোর্ড। এই যুবলীগ নেতাকে মিরপুর পল্লবী এলাকায় যুবরাজ হিসেবে জানে সবাই। জুয়েল রানার নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে উঠে ওই এলাকার লোকজন। যদিও নামের আগে তিনি ব্যবহার করেন আলহাজ্ব শব্দটি। বাসা থেকে যখনই বের হন তার ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো গাড়ির পেছনে থাকে মোটরসাইকেলের বহর। কখনও কখনও গাড়ি পরিবর্তন করেন জুয়েল। বিকালে বাউনিয়াবাদ এলাকায় দেখা মেলে তার। নিরাপত্তার জন্য তার গাড়িতে থাকে দুটি পিস্তল। তিনি দাবি করেন পিস্তল দুটি লাইসেন্স করা। মিরপুরের জুটের ব্যবসা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের মধ্যে অন্যতম জুয়েল রানা। এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য তার রয়েছে বিশেষ বাহিনী। ওই বাহিনীতে রয়েছে তার ভায়রা ভাই হেলাল। সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত হেলালের রয়েছে অস্ত্র। অভিযোগ রয়েছে কাজ পেতে বাধা এলেই তার দুর করতে ব্যবহার করেন অস্ত্র। অস্ত্র প্রদর্শন করলেই অনেক বাধা দুর হয়ে যায়। হেলালের সঙ্গে থাকে যুবলীগের জুয়েল রানার অনুসারী ক্যাডার বাহিনী।

মুন্সিগঞ্জের হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে জুয়েল রানা। ২০০৯ সালে মিরপুরের বাউনিয়াবাদ এলাকায় রিকশা চালাতেন জুয়েলের পিতা। একই পেশায় ছিলেন জুয়েলও। পরবর্তীতে বেশ কয়েক রিকশার মালিক হন তিনি। ওই এলাকায় একটি রিকশার গ্যারেজ গড়ে তোলেন। ওই সময়েই যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন জুয়েল। ওয়ার্ড থেকে থানা। অল্প দিনেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আর্শীবাদে আধিপত্য গড়ে তোলেন। বিদ্যালয়ের গন্ডি পার না হলেও পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে ওই এলাকায় রাজত্ব কায়েম করেন। একের পর এক জবর-দখল, হামলা, হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।

জুয়েল রানা আলোচনায় আসেন ২০১৪ সালে। ওই বছরের এপ্রিল মাসে বাউনিয়া বাঁধ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী জামেনা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অভিযোগ উঠে জুয়েল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। মাদ্রাসায় আসা-যাওয়ার পথে যৌন হয়রানি করা হতো ওই ছাত্রীকে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে হয়েছে তার স্বজনদের। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন জামেনার মামা আমির হোসেন। স্থানীয়রা জানান, জুয়েল রানার চাপের মুখে মামলাটি আপোস করা হয়েছে। মামলার আপোসের সত্যতা স্বীকার করেছেন নিহতের মামা আমির হোসেন।

ওই বছরের ১৪ই জুন পল্লবীর কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে হামলার ঘটনা ঘটে। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, জুয়েল রানার নেতৃত্বে বাউনিয়া বাঁধের রাজু বস্তিসহ আশপাশ বস্তিতে বিদুৎ সংযোগ দেওয়া হয় ক্যাম্প থেকে। এ নিয়ে বিরোধের জের ধরে শবে বরাতের রাত শেষে ভোরে সশস্ত্র হামলা চালানো হয় ক্যাম্পে। ওই সময়ে মোহাম্মদ ইয়াসিনের ঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আগুনে পুড়ে মারা যায় ওই পরিবারের ৯ জন। আজাদ নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ বিষয়ে জুয়েল রানাসহ তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছে বিহারীরা। ভিডিও চিত্রসহ অভিযোগ করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে। কিন্তু নিহতের স্বজনরা বাদি হয়ে কোনো মামলার করতে পারেননি। বিহারীদের নেতা সাদাকাত খান ফাক্কু জানান, পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করলেও ওই মামলায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে আসামি করা হয়নি। তাদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

সূত্রমতে, রিকশা চালক থেকে ক্ষমতার সাধ পেয়ে পাল্টে গেছেন জুয়েল। তার ব্যবহারের জন্য রয়েছে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি। কখনও প্রাডো, কখনও এক্সকরোলা, নোয়া ও জিপ গাড়িতে দেখা যায় তাকে। অন্তত চারটি গাড়ি রয়েছে তার। বাউনিয়াবাদ এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেয় জুয়েল চক্র। এমনকি এমনি বস্তির প্রতি ঘর থেকেও চাঁদা আদায় করা হয়। যদি স্ত্রী, সন্তান নিয়ে জুয়েল থাকেন বনানীর ডিওএইচএস এলাকার বিলাস বহুল বাড়ির নিজস্ব  ফ্ল্যাটে। বাউনীয়াবাদ এলাকায় রয়েছে তার কয়েকটি বাড়ি ও প্লট। পলাশ নগরে ১৫ কাঠা জয়গা, বাউনীবাদ এর কয়েকটি সরকারি জায়গা দখল করে গড়ে তুলেছেন দোকানপাট ও সমিল । পল্লবীর বালুর মাঠ দখল করে ভবন নির্মাণ করেছে জুয়েল ও তার সহযোগীরা।  সাভারে রয়েছে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি।

পলাশনগরে দোতলা একটি বাড়িটি দখলের অভিযোগ রয়েছে জুয়েল রানার বিরুদ্ধে। ওই বাড়ির মালিকদের একজন মাহবুব হাসান। তিনি জানান, অস্ত্র দেখিয়ে জিম্মি করে বাড়িটি দখল করেছেন জুয়েল। স্থানীয় স্বপন, রিয়াদ ও বাবুর কাছ থেকে তারা ১২ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন বাড়ির মালিকরা। ওই লেনদেন নিয়ে সালিসের নামে জুয়েল দুই কোটি টাকা মূল্যের বাড়িটি দখল করেন। বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় তার রয়েছে অন্তত চারটি বাড়ি। এরমধ্যে একটি বাড়ির নাম ‘মিম ভিলা’।  পলাশনগরে রয়েছে তার একটি বাড়ি। মিরপুর-১১ নম্বরের বি ব্লকে ঢাকা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ডুইপ) পৌনে এক কাঠা আয়তনের কমপক্ষে ১৫টি বাড়ি রয়েছে জুয়েল রানা ও তার স্বজনদের দখলে। অভিযোগ রয়েছে, কেনার নামে নানা কৌশলে বাড়িগুলো দখল করেছেন জুয়েল। জুয়েলের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি থানার কুন্ডের বাজার এলাকায় বিপুল টাকা ব্যয়ে গড়েছেন বিলাস বহুল অট্টলিকা। সূত্রমতে, ওই বাড়ির ছাদে রয়েছে সুইমিং পুল। বাড়িতে ব্যবহার করা হয়েছে দামি টাইলস, পাথর। এসব বিষয়ে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা বলেন, আমি কখনও জবর-দখলে জড়িত না। আমি ব্যবসা করি। রাজনীতি করি। রাজনীতি করি বলেই অনেকে অনেক অভিযোগ করে। কিন্তু আমি কোনো চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ড বা খারাপ কাজে জড়িত না। খারাপ লোক হলে আমাকে মাদ্রাসা ও মসজিদ এবং এনডিসি স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি করা হতো না। এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন তিনি।

সূত্র:মানবজমিন