বিয়ে নিয়ে প্রতারণাকারী কে এই মারুফা?

145

বিয়ে নিয়ে প্রতারণা এখন মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইচ্ছেমত দেন মোহর ধার্য করে কিছুদিন পরে ছেড়ে দেয়া এবং দেন মোহর ফেতর নিতে আইনি চাপ প্রয়োগ,

মারুফা ইয়াসমিন (রিতু) বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে অফিস করণিক হিসেবে চাকুরী করছে। বাহ্যিক সৌন্দর্য আর অসাধারণ ব্যবহারে বোঝার উপায় নেই কিভাবে বিয়ের মাধ্যমে প্রতারণা করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। ২০১১ সালে তার প্রথম বিয়ে হয় একজন উচ্চ পদস্থ কর্পোরেট কর্মকর্তার সাথে। কিন্তু বিয়ের পরই তার চাহিদা বাড়তেই থাকে। বেরিয়ে আসে আসল চেহারা। উচ্চাভিলাষী মারুফা তার সদ্য বিবাহিত স্বামীর কাছে তার একক নামে জায়গা কিনে দেয়া, ফ্ল্যাট নিজের নামে লিখে দেয়া, এফডিআর করে দিতে বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ দিতে থাকে। চাকুরীর সুবাদে ঢাকার বাইরে বদলি হলেও কোনোদিন যায়নি স্বামীর নতুন কর্মস্থলে। শুধুমাত্র স্বামীর সাথেই নয় কর্মকর্তার অসুস্থ মায়ের সাথেও দুর্ব্যবহার করে মারুফা। শাশুড়ির সাথে তার সম্পর্ক এতটাই খারাপ ছিল যে শাশুড়িকে মেরে ফেলার মত ঘটনা হয়েছে বলে চাপা গুঞ্জন শোনা যায়।

চাকুরীতে কিছুটা ঝামেলার সম্মুখীন হলে মারুফা তার সদ্য বিবাহিত স্বামীর পাশে না থেকে আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমাতে শুরু করে। এক পর্যায়ে একতরফা ডিভোর্স পাঠিয়ে দেয়। আর সুযোগ বুঝে হাতিয়ে নেয় চার হাজার ডলার, ২১ ভরি স্বর্ণ এবং নগদ ৯ লক্ষ টাকা। আর এ সমস্ত কাজ করানোর পিছনে সহযোগিতা করে মারুফার মা মুন্নি বেগম।

ডিভোর্স হতে না হতেই ২০১৪ সালে নতুনভাবে সংসার গড়ে সরকারি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করা এক ছেলের সাথে। সরকারী চাকুরী পাইয়ে দিবে বলে এমনটাই নাকি আশ্বাস ছিল এই বিয়ের মূল কারণ। আর হলও তাই। মারুফা হয়ে গেল অফিস সহায়ক। সংসারের নাম অভিনয় থাকল কিছুদিন। ঠিক ছয় মাস পরে একইভাবে একতরফা পাঠিয়ে নিয়ে নেয় ডিভোর্স।

ইতোমধ্যে পুনরায় যোগাযোগ করতে শুরু করে তার প্রাক্তন কর্পোরেট কর্মকর্তা স্বামীর সাথে। জেনে নেয় তার বর্তমান অবস্থা, চাকুরীর খোঁজ-খবর। যখনেই জানতে পারল একটি কোম্পানীর আরও বড় পদে স্থলাভিষিক্ত তখন মারুফা আবারও তার কাছে ফিরে আসতে চায়। তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত বলে ক্ষমা চাইলে প্রাক্তন স্বামী তাকে ক্ষমা করে মোহাম্মদপুরে কাজী অফিসে পুনরায় বিয়ে করে। ২০/০৮/২০১৪ তারিখে একজনকে ডিভোর্স দিয়ে ১৩/১২/২০১৪ তারিখে আরেকটি বিয়ে, এতে করে মারুফার ২০১৪ সালেই দুটি বিয়ে সম্পন্ন হয়। (যা প্রচলিত বৈবাহিক আইন এবং শরীয়তবহির্ভুত কাজ)

পুনরায় বিয়ে করা কর্মকর্তার কাছে মারুফা মধ্যবর্তী বিয়ের কথা গোপন রেখেই সংসার শুরু করে। এভাবেই বছরখানেক যাওয়ার পরে তিনি জানতে পারেন মারুফার আরকেটি বিয়ের কথা। এমনকি মধ্যবর্তী ডিভোর্স দেয়া সেই স্বামী তার বর্তমান স্বামীর কাছে সব ঘটনা খুলে বলে। মারুফা এবোর্শনের মাধ্যমে বাচ্চা নষ্ট করে সে কথাও জানায়। কিন্তু ততদিনে মারুফা বর্তমান স্বামীর বাচ্চার মা হতে চলেছে। সামাজিক স্ট্যাটাস ও নিজের ঔরসজাত সন্তানের কথা ভেবে মারিফাকে কিছুই না বলে নীরবে মেনে নিয়েই সংসার করতে লাগলেন।

২০১৬ সালে মারুফা এবং তার বর্তমান স্বামীর ঘরে ফুটফুটে সুন্দর এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কন্যা সন্তানের কারণে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায় বর্তমান স্বামীর। কন্যা সন্তান এবং এই ভালোবাসাকে পুঁজি করে মা মুন্নি বেগম এবং মারুফার চাহিদার মাত্রা আরও বেড়ে গেল। স্বামীর কিছু হয়ে গেলে সন্তানের ভবিষ্যৎ কি হবে এবং মারুফার-ই বা কি হবে এমন নানাবিধ অযাচিত আশঙ্কা এবং প্রশ্ন করে বিভিন্ন সময়ে তার স্বামীর নামের ফ্ল্যাট তার নাম লিখে দেয়া, এফডিআর করে দেয়া, জমি কিনে দেয়ার দাবি করতে থাকে। যদিও মারুফার নাম গাজীপুরে ৪ কাঠা এবং বরিশালে ১০ কাঠা জায়গা দেয়া হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে জায়গার বিনিময়ে স্বামীর থেকে নগদ টাকা নিয়ে নেয়।

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়’, তেমনভাবেই যখন মারুফার বিয়ে এবং চাকুরী পাওয়ার পরে ছলনা করে ডিভোর্স দিয়ে পুনরায় ফিরে আসা এসব ঘটনা জানার পরে তার বর্তমান স্বামী তার সন্তানের ভবিষ্যতকে মাথায় রেখে প্রয়োজনে সন্তানের নাম সবকিছু করে দিতে আপত্তি করে নি। তবে তিনি মারুফার এমন ঘৃণিত কার্যকলাপের জন্য তার নাম কোনকিছু দিতে সম্মত হয় নি।

এভাবেই চলতে থাকা সংসারে মারুফার জীবনে আরেকটি বিয়ে অধ্যায়ের সূচনা হতে চলল। নিজের সরকারি অফিসের রিপোর্টিং অফিসার ডেপুটি ডিরেক্টর আবু সায়েম খানের সাথে পরকীয়া প্রণয় শুরু হয়। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি এই প্রণয় বিয়েতে রূপ নেয়। মারুফার জীবনের চতুর্থ বিয়ে। কিন্তু এই বিয়ে সংঘটিত হওয়ার সময় মারুফা তার বর্তমান স্বামীকে তালাক প্রদান করেনি।

ডেপুটি ডিরেক্টর আবু সায়েম খান নিজেও বিবাহিত এবং ২ সন্তানের জনক এবং সে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের আলুব্দি এলাকায় তার নিজের একটি মাদ্রাসা রয়েছে এবং সেখানে তিনি মেজর হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের কর্মী ছিলেন বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন মারুফা আর আবু সায়েম খানের সম্পর্ক, বিবাহবহিৰ্ভূত মেলামেশার প্রমাণও পাওয়া যায়। আবু সায়েম মারুফাকে এনে তার মাদ্রাসার হুজুরের সহায়তায় এই অনৈতিক বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে। বিয়ের পরে আবু সায়েম ক্যান্টনমেন্টসংলগ্ন মাটিকাটা এলাকায় মারুফা ও তার মা মুন্নি বেগম এবং কন্যা সন্তানকে বসবাসের জন্য বাসা ঠিক করে দেয়। পুরো ঘটনা তার স্বামীকে না জানিয়ে করা হয়। উল্লেখ্য যে, সায়েম মারুফাকে একটি ফ্ল্যাট, ২৫ লক্ষ টাকার এফডিআর করে দিবে এবং ছোট ভাইকে সরকারি চাকুরী পাইয়ে দিবে বলে বিয়ে করে।

সাংসারিক অনাগ্রহের কারণ এবং আবু সায়েমের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক প্রশ্ন করলে মারুফা তার স্বামীর সাথে ঝগড়া করে আবু সায়েমের সাথে বিয়ের সব কথা বলে দেয়। মারুফা আবু সায়েমের সাথে থাকবে এবং যদি তাকে বাধা দেয়া হয় তাহলে মিথ্যা মামলা দিয়ে তার বর্তমান স্বামী ও কন্যার পিতাকে জেল খাটাবে বলে হুমকি দেয়। সন্তানের প্রতি মায়া দেখিয়ে এসব না করতে বার বার অনুরোধ করা হলেও মারুফা শোনেনি। পরে অফিসের মিটিং শেষে বাসায় এসে দেখে তাকে না জানিয়েই মারুফা তার মেয়ে এবং মা মুন্নি বেগমকে নিয়ে চলে গেছে। আর বাসা থেকে নগদ ৪ লক্ষ টাকা, প্রায় ১১ ভরি স্বর্ণলংকার, আসবাবপত্রসহ প্রায় ১১ লক্ষ টাকা মূল্যের মালামাল নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরীও করা হয়েছে, যার নাম্বার: 09/11/2019, GD-555।

মা হিসেবে মারুফা তার সন্তানকে কি ভবিষ্যৎ দিবে আর তার এই লোভাতুর নোংরা বিকৃত মানসিকতায় বিয়ে বিয়ে খেলা কোথায় থামবে এহেন ঘটনার জের ধরে তেজগাঁও থানায় মারুফার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে যার নাম্বার: 20/11/2019, No-27। ঘটনার প্রেক্ষিতে মারুফার স্বামী যিনি কন্যার বাবা তার সাথে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করা স্বত্ত্বে তিনি জানিয়েছেন, “পুরো ঘটনাই সত্য। আমার কাছে সকল কাগজপত্রই রয়েছে। সন্তানের কথা বলে মারুফাকে রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু তার আর তার মায়ের লোভের কাছে সাংসারিক জীবনের কোন মূল্যই নেই। যারা এমন করতে পারে তাদের কাছে আমার মেয়ে নিরাপদ না। তারা আমার মেয়ের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। বাবা হিসেবে আমি এটা মেনে নিতে পারবো না।”

তিনি আরও বলেন, “আজকাল পরকীয়ার জেরে অনেক ধরণের ঘটনা ঘটছে। আপনারা সাংবাদিকরা প্রকাশ করেন বলেই জানতে পারি। আপনারা বলেন এই রকম মহিলাদের কাছে আমার মেয়ের জীবন কি বিপন্ন নয়? তারা কি আমার মেয়ের জন্য ভালো কিছু করতে পারবে? আমি আমার মেয়ের জীবন সংকটে ফেলতে পারি না। ওদের কাছে আমার মেয়ে যেন সেফ থাকে।” কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি তার মেয়ের প্রতি আবেগ প্রকাশ করে ওর যেন কোনকিছু না হয় এবং তার মেয়েকে যেন তার কাছেই দিয়ে দেয়া হয় আদালতের কাছে জোড় হাতে এই প্রার্থনা করেছেন।

চাকুরীর জন্য মারুফাকে বিয়ে করে ভুক্তভোগী তিনিও নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন মোবাইলে পরিচয় এবং তাদের প্রণয় আখ্যান। তবে মারুফা যে আরেকজনকে বিয়ে করেছে সেটাও তার কাছে গোপন ছিল। বিয়ের পরে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে মারুফাকে চাকুরি ব্যবস্থা করে দেন তিনি। পরের কথা জিজ্ঞাসা করাতেই আক্ষেপ নিয়ে বললেন, “বাকিটুকু ইতিহাস। ছলচাতুরী করে আমার সন্তানকে এবোরশন করিয়েছে এই মারুফা আর তার মা। আমি অনেক চেষ্টা করেছি মারুফাকে বোঝাতে। কিন্তু কখনই আমার কথা শোনেনি। পরে জানতে পারলাম আরেকটি বিয়ে করেছে। আর তার পরে এসে জানলাম একজনকেই দুইবার বিয়ে করেছে। এরা যে এত খারাপ তা প্রকাশ করার ভাষা আমার নেই।”

কে এই মারুফা? চাকুরীর আইডি কার্ডে মারুফা ইয়াসমিন লেখা থাকলেও তার ডাকনাম রিতু বলে অনেকেই জানেন। পিত- মৃত ইউসুফ আলী মৃধা, মাতা- মুন্নি বেগম যাদের স্থায়ী ঠিকানা ১৪, শহীদ ক্যাপ্টেন মৃধা শামছুল হুদা সড়ক, হাতিখানা পূর্ব ক্যাম্প, পোস্ট ও থানা – সৈয়দপুর জেলা নীলফামারী এবং ঢাকায় ৮৮/১, মাটিকাটা, পোস্ট ও থানা- ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা – ১২০৬। ২০০৭ সালে মারুফার বাবার মৃত্যুর পিছনে নাকি মারুফ এবং তার মায়ের হাত আছে বলে জানা যায়। ২০০৯-১০ এ গ্যাং রেপের স্বীকার মারুফা হোটেলে অবৈধ কাজেও ধরা পড়লে তার মামারা থানা থেকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনে। তারপর থেকে এভাবেই চলছে তার পরবিত্তলোভ, অনৈতিক প্রণয়, বিয়ে এবং একতরফা ডিভোর্স দিয়ে মোহরানার টাকা আদায় করা। মা মুন্নি বেগমের প্রশ্রয়েই এসকল নীতি বিবর্জিত কাজ করে থাকে মারুফা। এক ভাই পঙ্গু এবং মা-মেয়ের এহেন কাজে বাধা দিতে নেই কোন আত্মীয়-স্বজন। সামাজিক ব্যাধি এই মারুফা এবং তার মা মুন্নি বেগমের যথাযথ শাস্তির দাবি করেছেন তার প্রাক্তন দুই স্বামী।

এ ব্যাপারে মারুফাকে ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি।