সাংবাদিক দোলনের হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার গল্প

33

সাংবাদিকতা ছেড়ে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে আরিফুর রহমান দোলন গত কয়েক বছরে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এর নেপথ্যে রয়েছে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম ভাঙিয়ে এলজিইডি’র কাজের ভাগ বাটোয়ারা, কমিশন এবং সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও অনলাইন পত্রিকা দিয়ে ব্ল্যাকমেলিং। সম্প্রতি ফরিদপুর থেকে গ্রেফতারকৃত দুই ভাই বরকত-রুবেলের দেয়া জবানবন্দি থেকে হাইব্রিড দোলনের ধনপতি হওয়ার রহস্যের এই থলের বেড়াল বেরিয়ে এসেছে। তার বিরুদ্ধে উঠে এসেছে আরও অসংখ্য অভিযোগ। এই দোলন বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে ছাত্রদল করতেন দাবি করে মন্ত্রীদের কাছে তদবির করে কাজ বাগিয়ে নিতেন।
চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, নাজমুল হুদা, সাদেক হোসেন খোকা ও এস এ খালেকের কাছে তিনি নিয়মিত তদবির করতেন।

আরিফুর রহমান দোলনের বাবা ছিলেন রূপালী ব্যাংকের একজন কেরানী। পৈত্রিক সুবাদে তেমন কোন জমা-জমি ছিলনা। প্রথম আলো পত্রিকায় রিপোর্টার হিসাবে চাকরি করতেন দোলন। একপর্যায়ে দুর্নীতির দায়ে তার চাকরি চলে যায়। চাকরি চলে যাওয়ায় স্ত্রীর সাথে গভীর মনোমালিন্য সৃষ্টি হলে শ^শুর বাড়ীর আত্মীয় তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। এই ঘটনার পরই দোলনের কপাল খুলে যায়। মন্ত্রীর সঙ্গে নানা উপায়ে ঘনিষ্টতা বাড়াতে থাকেন। নাম লেখান আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন কৃষক লীগে। মন্ত্রীর জামাই হিসেবে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে নিজেকে জাহির করতে থাকেন।

ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত¦ পাওয়ার পর হাইব্রিড দোলনের হাতে যেন ‘আলদিনের চেরাগ’ চলে আসে। এলজিইডি’র কাজের ভাগ বাটোয়ারা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। ঠিকাদারদের কাজ দেয়া, প্রজেক্ট পাস করানো, ইস্টিমেট বাড়ানো, নিয়োগ, বদলি এই সবই চলে তার কথায়। তিনি ফরিদপুরের বরকত-রুবেল দুই ভাইয়ের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ফরিদপুরে সন্ত্রাসীদের দিয়ে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী তৈরী করেন। দু’হাতে টাকা কামাতে থাকেন। এভাবে গত দশ বছরে তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান।

অতি সম্প্রতি বরকত ও রুবেলের বিরুদ্ধে প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ফরিদপুরের দুই ভাই কাহিনী- সন্ত্রাসীদের হাতে রাজনীতির চেরাগ’ শিরোনামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও আরিফুর রহমান ওরফে দোলনের নামও উঠে এসেছে। বরকত-রুবেল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, এলজিইডি’র কাজের ভাগ বাটোয়ারায় মন্ত্রণালয় এবং ঢাকার পার্ট আরিফুর রহমান দোলন দেখতেন।

আরিফুর রহমান দোলন অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজ গ্রামে রাজ প্রসাদ তৈরী করেছেন। ক্রয় করেছেন কোটি কোটি টাকার জমা-জমি। ঢাকার মিরপুরে গড়ে তোলেন বিশাল বিলাসবহুল বাড়ি। উত্তরা, ধানমন্ডি, গুলশানে বাড়ি এবং অনেকগুলো ফ্লাট কিনেছেন। থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে। চড়েন বিলাসবহুল গাড়িতে। রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে গ্রামের বাড়ি আসা-যাওয়া করেন হেলিকপ্টার যোগে। এ ছাড়াও ফরিদপুর-১ আসনের তিন থানায় তিন শতাধিক যুবককে কিনে দেন মোটরসাইকেল। যাকে খুশি তাকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানান চেয়ারম্যান। আরিফুর রহমান দোলনের কথামতো না চললে বিভিন্ন অপবাদে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেন। আবার তিনি ঐ অপবাদ থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে কথা বললে স্বাধীন নিউজ সহ একাধিক অনলাইন নিউজ পোর্টালে মিথ্যাচার করে সেই প্রতিবাদীদের সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে থাকেন। দোলন ভারত এবং মালয়েশিয়ায় নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

অবৈধভাবে উপার্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা জায়েজ করতে গিয়ে আরিফুর রহমান দোলন ঢাকা টাইমস নামের একটি অনলাইন পত্রিকা চালু করেছেন। এই অনলাইন পত্রিকা দিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদদের ব্ল্যাকমেল করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার নিজ নামে এবং স্ত্রী কন্যা ও মামা রবিউল, বন্ধু নাঈম, শহিদ সহ একাধিক নামে-বেনামে গড়েছেন অর্থের পাহাড় যা তদন্তে বের হয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
ফরিদপুর আলফাডাঙ্গার শিকদার লিটন জানান, আলফাডাঙ্গার কামার গ্রাম স্কুলের সভাপতি পদ আকড়ে ধরে আরিফুর রহমান দোলন স্কুলের জায়গা টিসিসির জন্য বিক্রি করে ৭২ লক্ষ টাকা নিজের ফাউন্ডেশনে জমা করেছেন। তাছাড়া কালো টাকা সাদা করতে দোলন ট্যাক্স দিয়েছে ৬৮ কোটি টাকা। ঢাকার একটি ফ্লাইওভার নির্মান ব্যয় বৃদ্ধি ৩ কোটির জায়গায় ৪৩ কোটি পাশ করিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে ২৩ কোটি টাকা। আলফাডাঙ্গা পৌরসভায় একটি বাড়ী জোর পূর্বক ভোগ-দখল করে রেখেছেন। বাদি থানায় মামলা করলেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। বাদি থানায় মামলা করলেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তার পরিচালিত ঢাকা টাইম্স অনলাইন পত্রিকা কালো তালিকাভুক্ত হয়ে বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার কিভাবে চালু হলো জনমনে এখন সেই প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে দোলন মানব পাচার, নারী কেলেংকারির সাথেও জড়িত। মানব পাচারের মাধ্যমে সে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।
শিকদার লিটন আরো জানান, জোরপূর্বক এক মহিলাকে তার গ্রামের বাড়ীতে আটকে রাখায় তার নামে আলফাডাঙ্গা থানায় জিডি হয়েছিল। তিনি বিএনপি ও জামাতের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসিত করতে প্রশাসনের প্রভাব খাটিয়ে বানিয়ছেন চেয়ারম্যান, মেম্বার। তাই তারা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও কটুক্তি করতে সাহস পায়। তাদের অনেকেই আজ চুরির দায়ে বরখাস্ত হয়েছে। দোলন এলাকায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহীনি। ফরিদপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল সাহার বাড়ীতে হামলার ঘটনায় বরকত-রুবেলের সাথে তারও ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।